আজ রবিবার, ২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৫ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি
আজ রবিবার, ২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৫ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

পররাষ্ট্র সচিব ও ইতালির রাষ্ট্রদূতের সামনে সন্তানের সন্ধান চেয়ে কাঁদলেন নাছিমা বেগম

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার দক্ষিন লোনসিং গ্রামের নাছিমা বেগমের ছেলে কামাল মুন্সি ( ৩০) অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার জন্য ৩ বছর আগে বাড়ি ছারেন। ২৯ জুনের পর আর তার সন্ধান পাচ্ছেন না পরিবার। ছেলের সন্ধান চেয়ে কাঁদলেন মা নাছিমা আক্তার।
শুক্রবার শরীয়তপুরে অভিবাসন সংক্রান্ত একটি মতবিনিময় সভায় ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নুনজিয়াতা ও পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনসহ অতিথিদের সামনে ওই মা কান্না করতে করতে তার সন্তানের সন্ধান চান।
কামাল মুন্সির পরিবার জানায়,শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভার দক্ষিন লোনসিং এলাকার মৃত ফজলুল হক মুন্সির চার ছেলে। তাদের মধ্যে মেঝ ছেলে কাসাল মুন্সি গ্রামে কৃষি কাজ করতেন। সংসারের অভাব দুর করতে ইতালি যাওয়ার জন্য স্থানীয় দালাল হানিফ সরদারের মাধ্যমে লিভিয়া যান। তখন ওই দালালকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দেয় কামালের পরিবার। এর পর লিভিয়ায় অবস্থান করা আরেক বাংলাদেশি দালাল হাসানের সাথে চুক্তি হয় কামালের পরিবারের। তাকে বিভিন্ন সময় দেয়া হয় আরো ১০ লাখ টাকা।
গত ২৯ জুন কামাল বাড়িতে ফোন করে মা নাছিমা বেগম ও স্ত্রী সামিয়া আক্তারের সাথে কথা বলেন। তাদের কাছে জানান ১ জুলাই তাকে নৌযানে করে ভূমধ্য সাগর পারি দিয়ে ইতালির সীমানায় পৌঁছে দেয়া হবে। ২৯ তারিখের পর আর কামালের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না পরিবার। গত ৩ জুলাই লিভিয়ার দালাল হাসান ফোন করে কামালের পরিবারকে জানায় ভূমধ্য সাগর পারি দেয়ার সময় কামাল হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। তার মরদেহ ফেরত পাঠানোর জন্য পরিবারের কাছে টাকা দাবী করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সহযোগিতায় শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসন মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন উৎসাহিত করার লক্ষ্যে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পৌরসভা মিলনায়তনে সভাটি অনুণ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান।  প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শরীয়তপুর ৩ আসনের সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক,ইতিলির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নুনজিয়াতা,পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন,স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব আখতার হোসেন,আইজিপি বেনজির আহম্মেদ,প্রবাসী কল্যান ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের সচিব আহমেদ মুনিরুছ ও শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার এসএম আশ্রাফুজ্জামান প্রমূখ।
পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন যখন মঞ্চে দাড়িয়ে মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহনকারিদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন তখন নাছিমা বেগম দাড়িয়ে কেঁদে ওঠেন। তিনি কান্না করতে করতে তার ছেলেকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আকুতি করতে থাকেন।
এমন পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন ওই নারীকে আশ্বস্ত করে বলেন,অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার সময় নিখোঁজ কামাল মৃধার সন্ধানে কাজ করবে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়। তিনি উপস্থিত সকলের প্রতি আহবান জানান অবৈধ পথে বিদেশ না যাওয়ার জন্য জনসচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে।
ইতালি যাওয়ার পথে নিখোঁজ কামাল মৃধার মা নাছিমা বেগম প্রথম আলোকে বলেন,আমরা গরিব নিরহ মানুষ। জমি-জমা বিক্রি করে সন্তানের উন্নত জীবন গড়তে দালালকে টাকা দিয়েছি।  এখন সন্তানেরও খোঁজ পাচ্ছি না। আমার সন্তানকে কি কেউ খুঁজে দেবে না? এমন অভাগা মায়ের পাশে কি রাষ্ট্র থাকবে না?
কামালের স্ত্রী সামিয়া আক্তার বলেন,বিয়ের কিছুদিন পরই সে ইতালি যাওয়ার জন্য রওনা হয়। স্বামীর পথ চেয়ে তিন বছর ধরে বসে আছি। ফোনে অনেক বার বলেছিলাম ফিরে আসতে। দালাল চক্র তাকে দেশে ফিরতে দেয়নি। তাকে জিম্মি করে বিভিন্ন সময় টাকা নিয়েছে। এখন তারই আবার স্বামীর মুত্যু সংবাদ দিয়ে টাকা চাচ্ছে। আমরা এখন কি করব? কিভাবে মানুষটার সন্ধান পাব?
মতবিনিময় সভায় বক্তব্যে ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নুনজিয়াতা বলেছেন,
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপদজনক পথে ইতালি গমন আমাদের সবার জন্য উদ্বেগজনক। তাই মানবিক কারণে জীবন বাঁচাতে শ্রম অভিবাসিদের প্রতারণা ও নির্যাতন থেকে বাঁচাতে সর্বোপরি মানব পাচার দমনে জনসচেতনতা বৃদ্ধি একান্ত প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিপদজন পথে যারা ইতালি যাবার ঝুঁকি নেয়, তারা মানব পাচারের শিকার হয়ে প্রতারণা,হিংস্রতা ও অত্যাচারিত হয়ে অমানবিক অবস্থায় পরে। ভূমধ্যসাগর এবং উত্তর-পশ্চিম আটলান্টিক সাগর পথ পাড়ি দিতে গিয়ে গতবছর ৩ হাজার ২৩১ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।
শরীয়তপুরে কর্মরত একুশে টেলিভিশনের সাংবাদিক আবুল বাশার বলেন,অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার সময় যত বাংলাদেশি নিখোঁজ ও মৃত্যুবরন করেন তাদের সিংহভাগ শরীয়তপুরের। গত ৩ বছরে শরীয়তপুরের ২০ ব্যক্তি লিভিয়া থেকে সমুদ্র পথে ইতালি যাওয়ার সময় মারা গেছেেন। আর নিখোঁ রয়েছেন শতাধিক তরুন

সংবাদটি লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন