আজ রবিবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৮ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি
আজ রবিবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৮ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

হার্ট অ্যাটাক ও এনজিওগ্রাম নিয়ে কিছু কথা

আমার এক বন্ধু রাত ৩টার সময় বুকে জ্বালাপোড়া বা চাপ বোধ করায় দ্রুত ঢাকার হৃদরোগের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। রোগীর অত্যধিক চাপ থাকায় সিসিইউতে কোনো বেড নেই। ফলে মেজেতে ম্যাট্রেস বিছিয়ে জরুরি চিকিৎসা শুরু হয়েছে। এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধ streptokinase প্রয়োগ করে রক্তনালির ব্লক খুলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যা খুবই প্রশংসার দাবিদার কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের পাঁচ দিন পর এনজিওগ্রাম করে রিং পরানো হয়েছে। এখানেই প্রশ্ন থেকে যায়। কেননা সময়ই এখানে মুখ্য নিয়ামক (principal predictor)।

হার্ট অ্যাটাক একটি জীবন বিপন্নকারী ব্যাধি। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে লেখালেখি করে বা টেলিভিশনে আমি বারবার বলে আসছি। হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কে সচেতন সবার একটি স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি।

প্রকট (acute) হার্ট অ্যাটাক দুই ধরনের হয় : ১। STEMI, ২। NSTEMI, প্রথমটির ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসা হলো- সঙ্গে সঙ্গে এনজিওগ্রাম করে রিং বা stent পরিয়ে দেওয়া। এবং এটি করতে হবে লক্ষণ শুরুর ১২ ঘণ্টার মধ্যে, নইলে হার্টের মাংসপেশির মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়। হার্ট ও ব্রেনের টিসু একবার ধ্বংস হলে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। সময়ই এখানে মুখ্য নিয়ামক। দেরি হয়ে গেলে বা দেরি করে রিং পরালে কাঙ্খিত ফল পাওয়া যায় না। এতে দীর্ঘমেয়াদি হার্ট ফেইল্যুর বা হার্টের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। যেসব জায়গায় (যেমন ঢাকার বাইরে দিনাজপুর, খুলনা, খাজা ইউনুস, চট্টগ্রাম ইত্যাদি ছাড়া) জরুরি এনজিওগ্রাম বা রিং পরানোর পর্যাপ্ত সুযোগ নেই সেখানে streptokinase বা tenectiplase দিয়ে রক্তনালির ব্লক খুলে দিতে হবে। তবে এর সাফল্য জরুরি রিং (primary angioplasty) এর চেয়ে অনেক কম এবং এসব ওষুধ প্রয়োগের ২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অবশ্যই এনজিওগ্রাম করতে হবে। নইলে হার্টের মাংসপেশির অপূরণীয় ক্ষতি হবে। বাস্তবতা হলো এই যে, অফিসটাইমের পরে কোনো সরকারি হাসপাতালে জরুরি এনজিওগ্রাম বা রিং পরানোর কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং যাদের সামর্থ্য আছে তাদের এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে রাত হোক দিন হোক বুকে অস্বাভাবিক ব্যথা, জ্বালাপোড়া, চাপ, গ্যাস বা শ্বাসকষ্ট হলে প্রথমেই জরুরি বিভাগে এসে ইসিজি করতে হবে। রাতে ব্যথা হলে সকাল পর্যন্ত বাড়িতে অপেক্ষা করা যাবে না।

 

এখন পর্যন্ত অফিস টাইমের বাইরে কেবল বেসরকারি হাসপাতালে জরুরি এনজিওগ্রাম এবং জরুরি রিং (primary angioplasty) পরানোর সুযোগ রয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে এটি ব্যয়বহুল মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা নয়। কেননা মাত্র তিন দিনের মধ্যেই রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন। এতে হার্টের পাম্পিং বা কার্যক্ষমতা প্রায় স্বাভাবিক থাকে। দীর্ঘমেয়াদে রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয়ত রিং বা stent এর দাম সরকার নির্ধারিত হওয়ায় সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে একই দাম নিতে বাধ্য। তাই সময়ক্ষেপণ করে পরে রিং লাগালে কাঙ্খিত ফল পাওয়া যাবে না। উন্নত বিশ্বসহ সারা দুনিয়ায় এটাই হলো হার্ট অ্যাটাকের বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক চিকিৎসা।

আরেকটি বিষয়। STEMI হার্ট অ্যাটাক নির্ণয় করতে শুধু একটি ইসিজিই যথেষ্ট, কোনো রক্ত পরীক্ষার আবশ্যকতা নেই। ইসিজি করে যদি দেখা যায় রোগীর STEMI হয়েছে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে জরুরি বিভাগ থেকে সরাসরি ক্যাথলাবে নিয়ে জরুরি এনজিওগ্রাম করে রিং পরাতে হবে।

প্রকট হার্ট অ্যাটাকের দ্বিতীয় ধরনটি হলো NSTEMI যেটা শুধু ইসিজি দিয়ে বোঝা যাবে না। রোগীর লক্ষণ, ইসিজি এবং রক্ত পরীক্ষা Troponin করে যদি দেখা যায় এটি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি তাহলে কিছু ওষুধ প্রয়োগ করে এক ধরনের রক্ত জমাটবিরোধী হেপারিন (injection Clexane) দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব এনজিওগ্রাম করে দেখতে হবে ব্লকের সংখ্যা, ধরন ও মাত্রা কেমন। ব্লকের চরিত্রের ওপর নির্ভর করবে রোগীর রিং লাগবে, বাইপাস (ওপেন হার্ট) সার্জারি লাগবে নাকি শুধু ওষুধ দিয়ে রাখা যাবে এবং প্রয়োজনে দ্বিতীয় আরেকজন কার্ডিওলজিস্ট বা সার্জনের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে হবে।

এনজিওগ্রাম কী?

করোনারি এনজিওগ্রাম (Coronary Angiogram), যা আমরা সংক্ষেপে এনজিওগ্রাম বলে থাকি, হার্টের রক্তনালির ব্লক নির্ণয়ে শতভাগ নিশ্চিত একটি পরীক্ষা। রক্তনালির ব্লক হলে হার্টের মাংসপেশিতে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত যেতে বাধাগ্রস্ত হয়। যদি এ ব্লক ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তাহলে রোগী একটু পরিশ্রম করলে বুকে ব্যথা, চাপ, বা শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন এবং বিশ্রাম নিলে আরাম বোধ করেন। এটাকে বলে স্টেবল অ্যানজাইনা (Angina)।

যদি বুকে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, শরীর ঘেমে যায়, রোগী আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন তাহলে বুঝতে হবে হয়তো কোনো রক্তনালি হঠাৎ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এটাকে আমরা বলি হার্ট অ্যাটাক (Heart attack)। এটি একটি জীবন বিপন্নকারী মারাত্মক রোগ। মানুষের মৃত্যুর যত কারণ আছে তার মধ্যে হার্ট অ্যাটাকই হচ্ছে সর্বপ্রথম এবং প্রধান কারণ।

অর্থাৎ অ্যানজাইনা বলি আর হার্ট অ্যাটাকই বলি দুটোই রক্তনালির ব্লক থেকে হয়ে থাকে। কিন্তু দুটোর কারণ, উপসর্গ এবং চিকিৎসা প্রায় আলাদা ধরনের। তবে উভয় ক্ষেত্রেই রোগ নির্ণয়ের একমাত্র শতভাগ নিশ্চিত যে পরীক্ষাটি তা হচ্ছে এনজিওগ্রাম। কিন্তু অ্যানজাইনার ক্ষেত্রে সেটি হচ্ছে রুটিন এনজিওগ্রাম যা যে কোনো সুবিধাজনক সময়ে করা যায়। আর হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সেটি হলো জরুরি এনজিওগ্রাম (urgent angiogram)। অর্থাৎ জরুরি এনজিওগ্রাম করার উদ্দেশ্য হলো- ব্লক নির্ণয়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বেলুন বা রিং (Stent) এর মাধ্যমে অপসারণ করা। এটাকে বলে জরুরি এনজিওপ্লাস্টি (Primary angioplasty/ PTCA)। রোগীর লোকজন অনেক সময় জরুরি এনজিওগ্রামের উদ্দেশ্য বা গুরুত্ব বুঝতে পারেন না । তারা ভাবেন হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে এনজিওগ্রাম না করে প্রথমে ওষুুধ দিয়ে চিকিৎসা করে পরবর্তী সময়ে এনজিওগ্রাম করানো যাবে। এটি সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা। সারা বিশ্বে জরুরি এনজিওপ্লাস্টি এখন হার্ট অ্যাটাকের প্রধানতম আধুনিক চিকিৎসা। এতে মৃত্যুহার, হার্ট ফেইল্যুর এবং ধুঁকে ধুঁকে মরার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।

এই যে এনজিওগ্রাম এটা নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা আছে। অনেক মনে করেন এটি অজ্ঞান করে একটি অপারেশন। খুব ব্যথা, ভয়ংকর ব্যাপার ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে এটি একটি অতি সাধারণ একটি পরীক্ষা। রোগীকে সম্পূর্ণ সজাগ রেখে সামান্য লোকাল অবশ করার ওষুধ দিয়ে মাত্র ৮ থেকে ১০ মিনিটের একটি পরীক্ষা যা একটি লাল পিঁপড়ার কামড়ের চেয়ে কোনোমতেই বেশি ব্যথার নয়। এতদিন ধরে এই পরীক্ষাটি পায়ের একটি ধমনি বা রক্তনালির মাধ্যমে করা হতো। ফলে রোগীকে ৬ ঘণ্টা চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে হতো যা কি না বয়স্ক বা স্থূলকায় মানুষের জন্য কিছুটা কষ্টকর। তা ছাড়া পায়ের ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণের একটা ঝুঁঁকি থাকে। এসব ঝামেলা এড়াতে আধুনিক বিশ্বে হাতের ধমনির মাধ্যমে এনজিওগ্রাম করা একটি সহজ ঝুঁঁকিমুক্ত পদ্ধতি। হাতের মাধ্যমে এনজিওগ্রাম (Radial angio- gram) করলে রোগী দিনের মধ্যেই বাড়ি চলে যেতে পারেন, শুয়ে থাকার কষ্ট নেই, হাঁটাচলা দিব্যি করতে পারেন।

এ radial angiogram and radial angioplasty এখন আমরা একটি রুটিন প্রসিডিওর হিসেবে করে থাকি। ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালসহ অনেক সেন্টারে এটি চালু আছে। এরই মধ্যে আমরা ৪ হাজার রেডিয়াল এনজিওগ্রাম এবং প্রায় ৮০০ রেডিয়াল এনজিওপ্লাস্টি সম্পন্ন করেছি। আমাদের সাফল্যের হার শহকরা নিরানব্বই ভাগ। এটি সম্ভব হয়েছে আমার ক্যাথল্যাব টিম এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ঐকান্তিক সহযোগিতায়। সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।

লেখক : সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট ও সিসিইউ ইনচার্জ, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হসপিটাল, ধানমণ্ডি, ঢাকা।

সংবাদটি লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন