আজ রবিবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৮ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি
আজ রবিবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৮ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি
ভ্রমণ

সিলেটের জাফলং ভ্রমণ এবং রথ দেখা ও কলা বেচা–প্রথম খন্ড…

…………………………

আসাদুজ্জামান জুয়েল

………………………..

প্রথম খন্ড…
করোনার করুনায় দীর্ঘদিন যাবৎ ঘর বন্দি মানুষ। শুধু আমিই নই। সারা বিশ্বের মানুষের একই দশা। কোথাও বের হওয়ার সকল দরজা বন্ধ। তাও পাকাপোক্ত ভাবে। মানে সরকারী নির্দেশনা মতে নানান বাধা বিপত্তির কারনে বাইরে যাওয়া নিষেধ। মানুষ হলো মুক্ত বিহঙ্গের মত। এক জায়গায় বেশিক্ষণ বা বেশিদিন স্থির থাকতে পারে না। আমি নিজেও নিজেকে মানুষ দাবী করি। তাইতো আমিও বেশিদিন এক জায়গায় থাকতে পারি না। একটু হাওয়া বদল করার বদ অভ্যাস আছে! ঘরে বেশিক্ষণ থাকতে পারি না, বাইরে যাওয়ার জন্য মন কাদে। বাইরে গেলে বেশিক্ষণ বা বেশিদিন থাকতে পারি না, ঘরের জন্য মন কাদে। বেশিক্ষণ হাটতে পারি না বিশ্রাম নিতে মন কাদে আবার বেশিক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারি না একটু হাটতে মন কাদে। একটানা বেশিক্ষণ কাজ করতে পারি না, একটু বেকার হতে মন চায়। আবার বেশিক্ষণ বেকার থাকতে পারি না, কাজের জন্য মন কাদে। কিন্তু এত কাদাকাদির মাঝেও আগে মন চাইলেই বেড়িয়ে পড়া যেত। যেখানে খুশি যাওয়া যেতো। যেভাবে খুশি ঘুরা যেত। বিশ্ব পরিস্থিতি সেই সুযোগের দরজা বন্ধ করে দিয়ে যেন চাবি ফেলে দিয়েছে কাজলা দীঘির গভীর জলে!
এক হাতে তালি বাজে না এটা একটা চিরন্তন প্রবাদ এবং সত্যি কথাও। তেমনি একা একা ঘুরতেও ভালো লাগে না। আর ঘুড়াঘুড়ির জন্য সকলের মন মানসিকতাও এক হয় না। ভ্রমণের জন্য ভ্রমণ পিপাসু মানুষ দরকার। তেমনি একজন বন্ধু আছে আমার। সে হলো শামীম সরদার। পেশায় ব্যবসায়ী, ঠিকাদার মানুষ শামীম সরদার। শত ব্যস্ততার মাঝেও, শত কাজের মাঝেও, শত চাপের মাঝেও একটা ভ্রমণ পিপাসু মন আছে সরদারের। শামীম সরদার রথ দেখার সাথে কলা বেচতে পছন্দ করে। বিটুমিন-রড-রোলার প্রয়োজন তো দে ছুট চট্রগ্রাম! পাথর প্রয়োজন তো ছুটে চলো সিলেট, রাজশাহী, কুষ্টিয়া। শামীম সরদারের নিজস্ব গাড়ি আছে। সেই সাথে সরদার নিজে ভালো ড্রাইভও করে। বিরামহীন গাড়ি চালাতে পারে। সরদারের ধৈর্যের যেন কোন বাধই নেই, ভাঙ্গবে কী!
শামীম সরদারের একটা কাজের জন্য প্রচুর সিলেটি মোটা বালু ও পাথর লাগবে। তাই যেতে হবে সিলেটের গোয়াইনঘাট। আগে থেকেই গোয়াইনঘাটে কয়েকজন পাথর-বালু ব্যবসায়ীর সাথে এবং জাহাজের চালকের সাথে কথা বলে রাখলো। সরাসরি দেখে শুনে কেনাই উত্তম ভেবে পরিকল্পনা শুরু হলো সিলেট যাওয়ার। সিলেটের গোয়াইন ঘাটে ভালো বালু ও পাথর পাওয়া যায়। এছাড়া জাফলংয়ের তামাবিল পোর্ট দিয়ে ভারত থেকেও বড় বড় কালো পাথরের বোল্ডার আমদানী হয় যেগুলো এলসি পাথর নামে পরিচিত। বোল্ডারগুলো বাংলাদেশে এনে স্টোন ক্রাশারের মাধ্যমে বিভিন্ন সাইজে ভাঙ্গা হয়। পাহাড়ের বুক জুড়ে পাথরের গদি আর পাথর ভাঙ্গার গগণবিদারী শব্দ এক ভিন্ন আমেজ উপভোগ করা যায়। গোয়াইনঘাট উপজেলার মধ্যেই জাফলং। স্পটদুটি কাছাকাছি হওয়ায় পরিকল্পনা হলো সিলেট থেকে প্রথমে গোয়াইনঘাট যাওয়ার। গোয়াইনঘাটে বালু ও সিঙ্গেলস পাথর দেখার পর জাফলংয়ে রাত্রিযাপন ও সৌন্দর্য উপভোগের সাথে তামাবিলের আমদানীকৃত কালো বোল্ডার ক্রাশ পাথরও দেখা হবে এমটাই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো।
এমনই পরিকল্পনা মাফিক এক মঙ্গলবার রাতে আমরা বেরিয়ে পড়লাম শরীয়তপুর থেকে। করোনার কারনে সব কিছু যে খারাপ হয়েছে তা কিন্তু নয়। আমাদের জন্য সময়টা ভালোই হয়েছে মনে হয়। ফেরি ঘাটে যাওয়ার সাথে সাথেই পেয়ে গেলাম ফেরি। ঢাকা পৌছাতে পৌছাতে গভীর রাত হয়ে গেলো। মঙ্গলবার রাতটা ঢাকায় কাটানোর জন্য হোটেলে উঠতে হবে। হোটেলে উঠার আগে রাতের ঢাকা দেখার জন্য এবং রাতের হাতিরঝিলের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগের জন্য চলে গেলাম হাতিরঝিলে। হাতিরঝিল ঘুরে চলে আসলাম হোটেলে। গভীর রাতে ঘুমুতে যাওয়ার একটা বিরম্বনা আছে। সহজে ঘুম আসতে চায় না আবার ঘুম একবার আসলে সহজে ভাঙ্গতেও চায় না। সকালে আমাদের ঘুম ভাঙ্গলো দেরিতে। বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে পরলাম। ঢাকা শহরের কিছু কাজ সেরে এবার সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার পালা।
মিরপুর বিআরটিএতে কিছু কাজ ছিলো শামীম সরদারের। গাড়ির ট্যাক্স টোকেন নবায়ন, কাগজত্র আপডেট সংক্রান্ত কিছু কাজ করতে হবে। সেখানে পরিচিত একজন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। অসহ্য যানজট ঠেলে আমরা বিআরটিএর কাছে যেতেই পেয়ে গেলাম সেই কাঙ্খিত ব্যক্তিকে। তাকে সকল কাগজপত্র বুঝিয়ে দেয়া হলো। এবার মিরপুর থেকে রওয়ানা দিব আমরা সিলেটের উদ্দেশ্যে। ঢাকা থেকে সিলেট বেরুনোর রাস্তা আমরা কেউই চিনি না। কোন দিক দিয়ে ঢাকা ছাড়লে সিলেট রোড ভালো হবে তা জানার জন্য গুগলের সহযোগীতা চাইলাম। গুগল ম্যাপসে ঢুকে ডেসটিনেশন দেয়ার পর আমাদের পথ দেখালো। গুগলের দেখানো পথে চলতে চলতে আমরা চলে গেলাম এয়ারপোর্ট রোডে। বিশ্বরোডের ফ্লাইওভারে উঠার নির্দেশনা দেখে ভাবলাম আমরা বসুন্ধরা এলাকার পাশ দিয়ে তিনশ ফিট রাস্তা ধরে মনে হয় ঢাকা ছাড়বো। কিন্তু গুগল আমাদের ফ্লাইওভার দিয়ে দুটি চক্কর কাটালো এবং খিলখেতের কাছে যাওয়ার পর গুগলের নির্দেশনামতে ফ্লাইওভার চক্কর দিয়ে এগুতে থাকলে গুগল ম্যাপস আমাদের নিয়ে গেলো উত্তরার পথ ধরে টঙ্গী। এর পর আর গুগলের প্রতি আস্থা রাখতে না পেরে মানুষকে জিজ্ঞেস করতেই বলে দিলো কিভাবে ঘোড়াশাল দিয়ে ভৈরব হয়ে সিলেটের পথে এগুতে হবে। চলতে থাকলো আমাদের গাড়ি…
গাড়িতে আমরা যাত্রী পাঁচজন। আমি, শামীম সরদার, চালক রাসেল, ধানুকার ইয়াসিন ভাই ও বাবুল সিকদার। বাবুল সিকদারকে আমরা কখনো বাবু ভাই বলি, কখনো বলি হাবু ভাই। বয়স্ক মানুষ হলেও রসিক বটে। হাবু ভাই দীর্ঘ পনের বছর আগে সিলেট গিয়েছিলো মাজার জিয়ারত করতে। এর পর আর যাওয়া হয়নি। আমরা সিলেট যাবো শুনে বায়না ধরে সেও যাবে। গাড়িতে গল্পের মাঝে চলছে গান। নানান ধারার গান বাজছেই। কখনো বাংলা, কখনো হিন্দী। কখনো বিরহের গান যাকে আমরা বলি কইলজা কাটা বিচ্ছেদ, কখনো পুতুপুতু প্রেমের গান। মাঝে মাঝে চলছে চলমান হিন্দী গানগুলোও। ভিডিওর সাথে অডিও। কেউ কথার ফাঁকে ফাঁকে ভিডিওতে চোখ বুলাচ্ছে, কেউ জানালা দিয়ে রাতের সৌন্দর্য দেখার সাথে সুরেলা গানগুলো শুনছে। কেউ ঘুমিয়ে পড়ছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য আমি আর শামীম সরদার একেক সময় একেক জনকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করে জাগিয়ে দিচ্ছি। ঢাকার যানজট থেকে বের হওয়ার পর পরই স্টিয়ারিং হুইল চলে গেছে শামীম সরদারের হাতে। গাড়ি যখনই শামীম সরদার ড্রাইভ করে তখনই আমার আসন হয় সামনে চালকের পাশের সীটে। সামনে বসে আর যাই করি না কেন ঘুমানো যাবে না এটা হলো আমাদের ভ্রমণের অন্যতম শর্ত। তাইবলে যে পিছনের আসনে বসে ঘুমানো যাবে তাও কিন্তু নয়। ঘুম একটি ছোয়াচে ধাচের রোগ। একজন ঘুমাতে শুরু করলে পাশের জনও ঘুমানো শুরু করে দেয়। এভাবে যদি ঘুমের ভাইরাস ছড়াতে থাকে তবে একসময় দেখাযাবে চালকও ঘুমের দেশে ঘুরতে চলে যাবে আর গাড়ি যাবে সেই চিরচেনা লডা ক্ষেতে! তাই কেউ যাতে ঘুমিয়ে না পড়ে সেদিকে আমি আর শামীম সরদার কড়া নজর রাখছি।
রাত জাগলে মাঝে মাঝে ঘুম একটু আধটু ধাক্কা মারবেই। আমাদেরও মাঝে মাঝে ধাক্কা মারছে। কিন্তু ঘুমের ধাক্কায় পড়ে গেলেতো হবে না। ঘুম তাড়ানোর জন্য ব্যবস্থা আছে। হাইওয়ে রাস্তার ধারে ঘুম তাড়ানোর দারুন সব বন্দোবস্ত আছে। বিশেষ করে পেট্রোল পাম্পে বা হোটেলগুলোতে সারা রাতই কেনা বেচা চলে। ঘুম ঘুম ভাব হলে দাড়িয়ে যায় গাড়ি কোন দোকানের সামনে। সবাই নেমে একটু গা ঝাড়া দেয়। কেউ কেউ ছুটে যায় দূর্বার বেগে মুত্র বিসর্জন দিতে। এর পর চা বা কফির ফাঁকে ফাঁকে চলে দাড়িয়ে দাড়িয়ে আড্ডা। কিছুক্ষণ আলাপচারিতা ও খাওয়া দাওয়ায় ঘুম চলে যায় পরবাসে। আমরা চাঙ্গা হয়ে আবার ছুটে চলি মহাসড়কের বুকচিরে। রাস্তার দু’ধারে নিকষ কালো অন্ধকারেরও যে অপরূপ সৌন্দর্য থাকে তা উপভোগ করতে থাকি। কখনো কখনো শেয়াল রাস্তার ধার থেকে জঙ্গলে ঢুকে পড়ে, আমাদের দেখে মুখ লুকায় লজ্জায় কিংবা ভয়ে। ছোট ছোট বাজারগুলোতে বন্ধ দোকান পাট পাহাড়ায় বসে আছে রাতের নিরাপত্তা কর্মী। শুনশান নিরব বাজারের বেওয়ারিশ নেড়ীকুত্তাগুলো আমাদের গাড়ির দিকে ঘেউ ঘেউ করে ছুটে আসে। গাড়ির ভিতরে থাকায় ভয় না পেয়ে বেশ মজাই পাই আমরা। এমন একটা ভাব করে যেন এখনই কামড়ে দেবে আমাদের। বাজারের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বাজার কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞার প্রতিদান স্বরূপ এহেন আচরণ করছে কুকুরগুলো। চলবে…
(দ্বিতীয় খন্ডের জন্য চোখ রাখুন আগামী কাল…)
আসাদুজ্জামান জুয়েল, আইনজীবী, পরিব্রাজক, কবি ও কলাম লেখক। asadjewel@gmail.com

সংবাদটি লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন